ডি জেড নিউজ ২৪ ডেস্কঃ
আজ দোসরা মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের গাড়ী বারান্দার উপর দাড়িয়ে তৎকালী ডাকসু ভিপি হিসেবে স্বাধীনতার রূপকার সিরাজুল আলম খান তথা নিউক্লিয়াস এর পরিকল্পনা ও নির্দেশে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত নতুন পতাকা জনসমুদ্রের মাঝে প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে উত্তোলন করা হয়। ২রা মার্চ, ১৯৭১ বাঙালি জাতির জীবনে একটি ঐতিহাসিক দিন। আমার রাজনৈতিক জীবনের শ্রেষ্ঠ উজ্জ্বলতম কীর্তি হচ্ছে ডাকসু’র ভিপি হিসেবে ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ‘স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা’ উত্তোলন। এ দিন বাংলাদেশের মানচিত্র অঙ্কিত হাজার বছরের লালিত স্বপ্নের পতাকা উত্তোলিত হয় আর বাঙালি জাতির "স্বাধীন রাষ্ট্রের" অস্তিত্বের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বুকে দাঁড়িয়ে বাঙালির আকাংখার প্রতিনিধিত্ব করে আমি ২রা মার্চ ১৯৭১ ‘স্বাধীন বাংলার পতাকা’ উত্তোলন করি। এ গৌরব আমার নয়, এ গৌরব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগ্র মুক্তিকামী মানুষ এবং ছাত্র-জনতার।
পতাকা উত্তোলনের দিন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাকে হত্যা করে আমার আত্মাকে যদি গ্রহ-নক্ষত্রের উপরে ঊর্ধ্বলোকে পাঠিয়ে দিতো তবুও জীবন নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ হতো না। পতাকা উত্তোলনের সময় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আতঙ্ক স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রসেনানী ছাত্রসমাজের নেতৃবৃন্দ আমার সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারা সকলেই পতাকা উত্তোলনের মাহেন্দ্রক্ষণের অংশীদার। বাঙালির স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রাম-আন্দোলনে যে কয়টি অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ঘটনার জন্ম হয়েছে তারমধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে পতাকা উত্তোলন। পতাকা উত্তোলনের ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সবচেয়ে বেশি মহিমান্বিত করেছে।
১৯৭০-এর ৬ জুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল আজকের জহুরুল হলের ১১৬ নং কক্ষে বসে ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসে’র প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খানের পরামর্শে আমি, শাহজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমদ ও মনিরুল ইসলাম বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের জন্য পতাকা তৈরীর পরিকল্পনা করি। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিনে বসে তৈরি করার পরিকল্পনা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পতাকা উত্তোলন বিশ্বে একটি বিরল ঘটনা।
পতাকা উত্তোলন সশস্ত্র যুদ্ধকে অনিবার্য এবং আবশ্যক করে তুলে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
আমি ও শাজাহান সিরাজ তৎকালীন ইকবাল হলের যে রুমে থাকতাম সেই ১১৬ নম্বর কক্ষে বসেই সিরাজুল আলম খান সহ নিউক্লিয়াস নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতার ইশতেহার প্রণয়ন করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা নির্ধারণ, জয়বাংলা স্লোগান ও আন্দোলনের কর্মসূচিসহ বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে ইশতেহার চূড়ান্ত করা হয়। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ বা ঘোষণা পাঠ করেন। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পক্ষের চার ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আমি আসম রব এবং আব্দুল কুদ্দুস মাখন শপথ বাক্য পাঠ করি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো রাজনৈতিক “জনযুদ্ধ”। মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি দীর্ঘ অথচ ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল। সংগ্রামের ধারাবাহিকতা-স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা এবং চূড়ান্ত লড়াই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অসংখ্য ঘটনাবলী, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য দিক, গোপন পরিকল্পনা-সিদ্ধান্ত জানা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে কত মানুষের অপরিসীম ত্যাগ-অসম সাহসিকতা-বীরত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে তা সবাই জ্ঞাত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। যে যে কাজের সাথে যতটুকু সম্পৃক্ত, সে ততটুকুই জানে। সামগ্রীক কর্মকান্ডের সাথে যারা যুক্ত নয় তারা সবকিছু জানার কথা নয়।
“প্রকাশ্যে” ও “অপ্রকাশ্যে” এই দুই ধরণের কর্মকান্ডের সমন্বয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। সুতরাং যারা এই দুই ধরনের কর্মকান্ড সম্পর্কে অবিহিত নয় বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা মুক্তিযুদ্ধকে তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বদলে দিতে পারে না।
১৯৬২ সাল থেকে সিরাজুল আলম খান এর নেতৃত্বে অপ্রকাশ্যে স্বাধীনতার জন্য যে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা, জাতির মনন প্রস্তুত করা, ছাত্র-যুবকদের সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা, অস্ত্র সংগ্রহ, ‘জয় বাংলা বাহিনী’ গঠন, স্বাধীন বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা ২রা মার্চ উত্তোলন, ৩রা মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেই স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ ও ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ সবই অগ্নিঝরা মার্চের কীর্তি।
“বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর”, “তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা”, “পাঞ্জাব না বাংলা-বাংলা বাংলা”, পিন্ডি না ঢাকা-ঢাকা ঢাকা, জিন্না মিঞার পাকিস্তান-আজিমপুরের গোরস্থান শ্লোগানসহ জাতির অস্তিত্বের নির্যাস “জয়বাংলা শ্লোগান” “বঙ্গবন্ধু” উপাধি নির্ধারণ, “বিএলএফ” গঠনসহ এগুলোর রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।
১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে নেতৃবৃন্দ ‘নিউক্লিয়াস’ ও ‘বিএলএফ’ এর গঠন এবং সাংগঠনিক বিস্তৃতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে অবিহিত করেন। এই বৈঠকের কয়েক দিন পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব লন্ডনে যান এবং সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ দূতের সাথে বাঙালীর স্বাধীনতার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। লন্ডন থেকে দেশে ফিরে তিনি ‘নিউক্লিয়াস’ নেতৃবৃন্দকে ডেকে ভারতের সাথে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সে অনুযায়ী ‘নিউক্লিয়াস’ নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের দু’টি সীমান্ত এলাকা দিয়ে অস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা সম্পন্ন করেন।
১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু ‘বিএলএফ’ এর চার নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মনি এবং তোফায়েল আহমেদকে ডেকে চিত্তরঞ্জন সূতার এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ‘বিপ্লবী বাংলা’ এবং ‘জয় বাংলা’ নামে গোপন পত্রিকা প্রকাশ, বুকলেট,লিফলেট, পুস্তিকা ইত্যাদির মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক সাহিত্য সৃষ্টি করে স্বাধীনতার চেতনায় জাতিকে উজ্জীবিত করার কাজটি অত্যান্ত সুকৌশলে ‘নিউক্লিয়াস’ পালন করেছিল ।
৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬র ৬-দফা ও ১১-দফা আন্দোলন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার আন্দোলনকে এক দফায় রূপান্তর করে স্বাধীনতার বিষয়কে সামনে নিয়ে আসার রূপরেখা প্রণয়নসহ আন্দোলনের মূল দায়িত্ব পালন করে ছাত্র-যুব নেতৃত্ব।
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১৮/১৯ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিএলএফ এর চার নেতা সহ তাজউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে স্বাধীনতা বিষয়ে আলোচনায় বসেন। বৈঠকে বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিন আহমেদকে স্বাধীনতার প্রশ্নে বিএলএফ এর চার নেতা সম্পর্কে বিস্তারিত বিষয়ে অবগত করেন।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে ৩ মার্চ তারিখে গণপরিষদের অধিবেশন বাতিল করলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। এ সময় বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বানীতে পার্লামেন্টারী দলের বৈঠক করছিলেন। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলে তিনি(নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী) আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুকুম দেন। শুরু হয় স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষ আন্দোলন। ‘নিউক্লিয়াস’ এর পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২রা মার্চ ডাকসুর ভিপি হিসেবে আমি স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। তখন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে উঠে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। এই পরিষদের চার নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন এবং আমি ৩রা মার্চ পল্টনের জনসভায় ‘স্বাধীন সার্বভৌম’ বাংলাদেশের কর্মসূচী ঘোষণা করি। ইশতেহারটি পাঠ করেন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শাজাহান সিরাজ। ইশতেহারের ঘোষণায় বলা হয়-
১) ৫৪ হাজার ৫ শত ৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগলিক এলাকার ৭ কোটি মানুষের আবাসিক ভুমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম ‘বাংলাদেশ’।
২) স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশর জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ সংগীতটি ব্যবহৃত হবে।
৩) উপনিবেশবাদী পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে হবে।
৪) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক।
৫) ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় শ্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
এ ছাড়াও স্বাধীনতার ইশতেহারে স্বাধীন বাংলা সরকারের কাঠামো-স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন কর্মপন্থা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মকৌশল ও পদ্ধতির দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়।
৩রা মার্চ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর সামনেই স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পক্ষে চার ছাত্র নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন ও আমি স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ের পড়ার শপথ বাক্য পাঠ করি। শপথ শেষে ‘জয় বাংলা’ বাহিনীর ডিপুটি চীপ কামরুল আলম খান খসরু আনুষ্ঠানিক ভাবে গান ফায়ার করেন এবং হাসানুল হক ইনু পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়।
মার্চের ৩ তারিখ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিএলএফ এর চার নেতার সাথে বৈঠক করেন। বৈঠক স্বাধীনতা আন্দোলন বিষয়ে আলোচনা হয়। মার্চের ৪ তারিখে বঙ্গবন্ধু বিএলএফ এর চার নেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদকে ডেকে ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড সম্পর্কে অবহিত করেন। বঙ্গবন্ধু জানান বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড গঠিত হয়েছে। ৫ মার্চ ৭ মার্চের ভাষনের বিষয় নিয়ে প্রথমে বিএলএফ এর হাই কমান্ড সিরাজুল আলম খান সহ চার নেতার সাথে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা হয়। ৬ মার্চ রাত ১২টায় বিএলএফ ‘হাইকমান্ড’ এর সাথে বঙ্গবন্ধুর পুন:রায় আলোচনা হয়। সেদিন অধিক রাতে ৭ মার্চের ভাষণ বিষয়ে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।
৭ই মার্চেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা করা হয়। এর ভিত্তিতেই জনগণ বিকল্প রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ‘জয় বাংলা’ বলেই বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণ শেষ করেন। আমরা মঞ্চে উপস্থিত ছিলাম।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে ‘আর আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ, প্রতিরোধ গড়ে তোলা’র আহ্বান জানিয়েছেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সুতরাং জাতি অসহযোগ আন্দোলনকে সশস্ত্র আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়। জাতির এই লৌহকঠিন ঐক্যবদ্ধ প্রস্তুতির কারণেই তখনকার সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে বাঙালী বীর সন্তানরা এমনকি সুদুর পাকিস্তান থেকেও মৃত্যুকে উপেক্ষা করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সমগ্র জনগণের অন্তরাত্মার প্রস্তুতি অনুভব করেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করার তারা নৈতিক শক্তি পেয়েছেন।
জাতি ভিত্তিক একটি রাষ্ট্রে অভ্যূদয় রাজনৈতিক সংগ্রাম ও জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং ‘নিউক্লিয়াস’ ও ছাত্রলীগের কর্মকান্ড, গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র যুদ্ধের বীরত্বব্যঞ্জক ঘটনাবলী এবং ত্যাগের ইতিহাসকে গোপন করে রাখাই হবে অপকৌশল। অগ্নিঝরা মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় দিনের প্রতিটি ঘন্টা, প্রতি ২৪ ঘন্টা এবং যতই ২৬ মার্চ ঘনিয়ে আসছিল ততই তখকার জনগোষ্ঠির মধ্যকার ছাত্র-যুব সমাজের অদম্য এবং সাহসীক প্রত্যয় সবকিছুকে অতিক্রম করে স্বাধীনতার জন্য শেষ লড়াই সশস্ত্র যুদ্ধ সংগঠিত করার প্রস্তুতি নিয়েছিলো তাও প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসের পরিবর্তে ‘বিএলএফ’ ও ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে’র পক্ষ থেকে প্রতিরোধ দিসব পালিত হয় এবং সারা দেশের ঘরে ঘরে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলিত হয়। আমরা ছাত্ররা ভোরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ছাদে, হাইকোর্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উড়িয়ে দেই। দুপুরে জয় বাংলা বাহিনীর পক্ষে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে দেই। ২৩ মার্চ গভীর রাতে ‘নিউক্লিয়াস’ ও ‘বিএলএফ’ এর নেতৃবৃন্দের সাথে চার ঘন্টাব্যাপী বৈঠক হয়। পরদিন ২৪ মার্চ সকালে অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধুর সাথে ইয়াহিয়ার বৈঠকের জন্য তৎকালীন গণভবনে বঙ্গবন্ধু রওয়ানা হলেন। আমি গাড়ির এক পাশে কালো পতাকা আর অন্য পাশে স্বাধীন বাংলার পতাকা বেঁধে দেই।
রাজনৈতিক নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। সে মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকাও গৌরবোজ্জ্বল আর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকায়ও অনস্বীকার্য। ‘জাতি-রাষ্ট্র’ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে কাহিনী অনুসন্ধান ও গবেষণার মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস নির্মান করতে হবে।
লেখকঃ আ স ম আবদুর রব
ডাকসু ভিপি (১৯৭০-৭২)
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ জাকির হোসেন (মনু)
01712-364264
zakirhossain215@gmail.com
D NRWS