মোঃ দেলোয়ার হোসেন বাবলু, টঙ্গীঃ
সকাল হলেই উড়ে যায়। সারাদিন ঘুরে বেড়ায় এদিক-ওদিক। কখনো জলাশয়ে, কখনো খোলামাঠে। অথচ দিনশেষে সূর্য যখন ডুবতে শুরু করে, তখনই যেন তার মনে পড়ে যায় একজনের কথা । উড়ে উড়েনফিরে আসে এক মাছের দোকানে । তারপর সোজা গিয়ে বসে পড়ে মাছ বিক্রেতা জসিমের কোলে । যেন সারাদিনের ঘোরাঘুরি শেষে এই মানুষটির কাছেই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
জসিমও যেন অপেক্ষায় থাকেন তার ফেরার। বকটি ফিরে এলে নিজের হাতে মাছ খাওয়ান। কখনো বকটি বসে থাকে তার কোলে, কখনো মাছ বিক্রির টেবিলে। আবার জসিম দোকান থেকে একটুদূরে গেলেই তার বসার কাঠের পিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকে বকটি। দোকানে অপরিচিত কেউ এলে কখনো তেড়ে যায়, ভয় দেখায়। অথচ জসিম ফিরে এলেই শান্ত হয়ে যায় সে। এভাবেই ছয় মাস ধরে গড়ে উঠেছে মানুষ আর পাখির এক অদ্ভুত মায়ার সম্পর্ক। যে পাখিকে একদিন কুড়িয়ে পেয়েছিলেন জসিম, সেই পাখিই এখন প্রতিদিন নিজের ইচ্ছায় তার কাছে ফিরে আসে। নেই কোনো খাঁচা, নেই শিকল। আছে শুধু ভালোবাসার টান।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চকপাড়া গ্রামের মেডেকের মোড়ের মাছ বিক্রেতা জসিম উদ্দিনের (৩০) সঙ্গে একটি কানি বকের এমনই বন্ধুত্বের গল্প এটি। জসিম উদ্দিন ওই গ্রামের মানিক মিয়ার ছেলে।
জসিমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ছয় মাস আগে বাড়ির পাশের বাঁশঝাড় থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল বকের ছানাটি। খবর পেয়ে ছানাটিকে কুড়িয়ে আনেন জসিম। তখন তার বয়স আনুমানিক ১০ থেকে ১২ দিন। এত ছোট ছানাটি নিজের মতো করে বাঁচতে পারবে কি না, তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা ছিল তাঁর। মাছের দোকানের ভেতরেই ঠাঁই হয় ছোট পাখিটির। দিন যায়, ছানাটি বড় হতে থাকে। জসিমের হাত থেকে মাছ খেতে খেতে একসময় উড়তেও শিখে যায় সে। তখন চাইলে তাকে আটকে রাখতে পারতেন জসিম। কিন্ত তিনি তা করেননি। পাখিটি ধীরে ধীরে নিজের ডানা মেলে আকাশে উড়তে থাকে।
এখন সকালে উড়ে চলে যায় অজানা গন্তব্যে। সারা দিন ঘুরে বেড়ায় নিজের মতো করে। কিন্ত সন্ধ্যা নামলেই সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে আবার ফিরে আসে বকটি। উড়ে এসে বসে পড়ে জসিমের কোলে। জসিমও তাকে পরম মমতায় মাছ খেতে দেন। এভাবেই প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মাছের দোকানে বসে থাকে বকটি। এরপর রাতে মাছের দোকানের ভেতরেই অবস্থান করে সে। পরে সকালে দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মতো উড়ে চলে যায়। জসিমের এই পাখিপ্রেমের কথা ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়। অনেকেই দোকানে এসে বকটিকে দেখেন। কেউ কেউ সেটি কিনতে চান। দামও বলেন অনেক। কি জসিমের কাছে বকটি বিক্রির কোনো ইচ্ছাই নেই।
জসিম বলেন, ‘ছোট থাইক্যা পাখিডারে লালনপালন করছি। এহন ওর প্রতি আমার অনেক মায়া লাগে। প্রতিদিন নিজের হাতে মাছ খাওয়াই। অনেকে আইসা কয়, বকটা বেইচা দিতে। অনেক দামও কয়। কিন্ত আমি বেইচা দিমুনা। আমি তো তাকে ভালোবাসি।’ কথা বলতে বলতে পাখিটির নিরাপত্তা নিয়ে অন্যদের সতর্কবার্তার কথা তুলে ধরেন তিনি।অনেকে তাকে বলেন, বকটি একদিন তার চোখের ক্ষতি করতে পারে, বিপদ ঘটাতে পারে। তাই পাখিটিকে দূরে রাখতে বলেন কেউ কেউ। কিন্ত এসব কথায় দমে যান না জসিম। তার কথায়, ‘অনেকে কয়, বক কিন্ত তোর ক্ষতি করবে, সাবধান। আমি কারও কথা কানে নিই না। সে যেহেতু আমারে ভালোবাইসা প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসে, আমিও তারে ভালোবাসি।’ জসিম বলেন, ‘আমি তো তারে বন্দি করি নাই। কোনো দিন বন্দি করব না। সে তার মতো সকালে উড়ে যায়, আবার সন্ধ্যায় আমারে আপন মনে কইরা ফিরে আসে। আমি তারে কেন বন্দি করবো ?’
একটুথেমে তিনি আরও বলেন, ‘সে যদি কোনো দিন চইলা যায়, আর না আসে, আমার হয়তো অনেক দুঃখ লাগবে। কিন্ত এইটা ভাইবা শান্তি পামু, সে তার জায়গায় ভালো আছে। আমি তারে কোনো দিন বিরক্ত করি না, করবও না। আমার কাছে প্রত্যেক প্রাণী সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণীদের চলার স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ।’
পাখির মনের কথা মানুষ জানেনা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বকটির ফিরে আসার পেছনে অভ্যাস, নিরাপত্তা কিংবা খাবারের আকর্ষণ, বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবুছয় মাস ধরে তার এই ফিরে আসা, জসিমের কোলে বসা আর তার পাশে নির্ভয়ে সময় কাটানোর দৃশ্য দেখে মুগ্ধ স্থানীয় পরিবেশকর্মী সাইদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা, জসিম উদ্দিন বকটিকে বন্দি করে রাখেননি। আমার মনে হয়, পাখিটি জসিমের মায়ায় বন্দি হয়ে গেছে। এজন্য সারা দিন উড়ে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় তার কাছে চলে আসে। জসিম কোনো পাখিকে বন্দি করা বা বিক্রি করা পছন্দ করেন না। তার এই ভালোবাসা দেখে আমি অভিভূত। সব পশুপাখি তাদের নিজ পরিবেশে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ জাকির হোসেন (মনু)
01712-364264
zakirhossain215@gmail.com
D NRWS