
দৈনিক দুপুরের খবর ডেস্কঃ
স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—এই তিনটি বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। কমিশন আগের মূলনীতি গণতন্ত্র বহাল রেখে নতুন চারটি মূলনীতি সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার ও বহুত্ববাদ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের মহান আদর্শ এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনস্বরূপ সংবিধান ও রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে এই পাঁচটি নীতি প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের প্রযোজ্য সব ক্ষেত্রে ‘প্রজাতন্ত্র’ ও ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘নাগরিকতন্ত্র’ ও ‘জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ’ শব্দগুলো ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে। এ সময় সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ তাঁদের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি জানান, তাঁরা সংবিধান সংশোধনে গণভোটের সুপারিশ করেছেন। কমিশন সংবিধানের মূলনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ এবং এ-সংশ্লিষ্ট সংবিধানের ৮, ৯, ১০ ও ১২ অনুচ্ছেদগুলো বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
একজন সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা এবং রাজনৈতিক দলের প্রধানের যেকোনো একটিতে থাকতে পারবেন। এ ছাড়া দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের আসনসংখ্যা ৫০৫, উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স ২১ বছর নির্ধারণসহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ছয়টি কমিশনেরই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
এরপর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এসব প্রতিবেদন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হবে, সেসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রতিবেদনে একটি কার্যকর গণতন্ত্র, মৌলিক মানবধিকার সুনিশ্চিতকরণ এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাতটি প্রধান বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। সেগুলো হচ্ছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের মহান আদর্শ এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনস্বরূপ সংবিধান ও রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র, ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রী পদের একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস, অন্তর্বর্তী সরকার কাঠামোর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত এবং মৌলিক অধিকারের আওতা সম্প্রসারণ, সাংবিধানিক সুরক্ষা ও বলবেযাগ্যতা নিশ্চিতকরণ।
সংস্কার কমিশন একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব করছে।
সেখানে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের একটি নিম্নকক্ষ ও একটি উচ্চকক্ষ থাকবে। উভয় কক্ষের মেয়াদ হবে চার বছর। নিম্নকক্ষ গঠিত হবে সরাসরি নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যগরিষ্ঠ ভোটে। ৪০০ আসনের নিম্নকক্ষে ৩০০ জন সদস্য একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। আরো ১০০ জন নারী সদস্য দেশের সব জেলা থেকে শুধু নারী প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। রাজনৈতিক দলগুলো নিম্নকক্ষের মোট আসনের ন্যূনতম ১০ শতাংশ আসনে তরুণ-তরুণীদের মধ্য থেকে প্রার্থী মনোনীত করবে। সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ন্যূনতম বয়স ২১ বছর করা হবে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, একজন সংসদ সদস্য একই সঙ্গে নিম্নলিখিত যেকোনো একটির বেশি পদে অধিষ্ঠিত হবেন না : প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা এবং রাজনৈতিক দলের প্রধান। অর্থ বিল ব্যতীত নিম্নকক্ষের সদস্যরা তাঁদের মনোনয়নকারী দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা পাবেন। আইনসভার স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি সব সময় বিরোধীদলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত হবেন। জাতীয় সংসদে দুজন ডেপুটি স্পিকার থাকবেন, যাঁদের মধ্যে একজন বিরোধী দল থেকে মনোনীত হবেন।
সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত করে এমন কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের আগে আইনসভার উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন নিতে হবে। অভিশংসন রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। নিম্নকক্ষ অভিশংসন প্রস্তাবটি পাস করার পর তা উচ্চকক্ষে যাবে এবং সেখানে শুনানির মাধ্যমে অভিশংসনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, আইনসভার নিম্নকক্ষে যে সদস্যের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন আছে, তিনি সরকার গঠন করবেন। নাগরিকতন্ত্রের নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা দ্বারা প্রয়োগ করা হবে। কমিশন রাষ্ট্রপতির কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের কথা সুপারিশ করছে; এই বিশেষ কার্যাবলি কিংবা সংবিধানে উল্লেখিত বিষয় ছাড়া অন্য সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে কাজ করবেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবিধানে বাংলাদেশে নাগরিকদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহৃত সব ভাষা এ দেশের প্রচলিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। বাংলাদেশের নাগরিকরা ‘বাংলাদেশি’ বলে পরিচিত হবে।
সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ হবে চার বছর। রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ দুইবারের বেশি থাকবেন না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচকমণ্ডলীর (ইলেকটোরাল কলেজ) সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। নিম্নকক্ষ থেকে অভিশংসনপ্রক্রিয়া শুরু হবে।
সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আইনসভার নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হবেন। আইনসভার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগে যদি কখনো প্রধানমন্ত্রী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন বা আস্থা ভোটে হেরে যান কিংবা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতিকে আইনসভা ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেন, সে ক্ষেত্রে যদি রাষ্ট্রপতির কাছে এটা স্পষ্ট হয় যে নিম্নকক্ষের অন্য কোনো সদস্য সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জন করতে পারছেন না, তবেই রাষ্ট্রপতি আইনসভার উভয় কক্ষ ভেঙে দেবেন। একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ দুইবার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না তিনি।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আইনসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে কিংবা আইনসভা ভেঙে গেলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে। এই সরকারের প্রধান ‘প্রধান উপদেষ্টা’ বলে অভিহিত হবেন। আইনসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে অথবা আইনসভা ভেঙে গেলে, পরবর্তী অন্যূন ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা সর্বোচ্চ ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে কার্য পরিচালনা করবেন। এই সরকারের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৯০ দিন হবে, যদি নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হয় তবে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করা মাত্র এই সরকারের মেয়াদের অবসান ঘটবে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল থাকবে। তদন্ত ও অনুসন্ধানের জন্য অভিযোগ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে প্রেরণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপ্রধানের পাশাপাশি জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (ন্যাশনাল কনস্টিটিউশন কাউন্সিল বা এনসিসি) থাকবে।
বিচার বিভাগকে পূর্ণ আর্থিক স্বাধীনতা প্রদানের সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। সেখানে বলা হয়েছে, স্থানীয় আদালতের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি, শৃঙ্খলাসহ সব সংশ্লিষ্ট বিষয় সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত থাকবে।
সংস্কার কমিশন সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত সব কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কর্মসূচির অংশ না হলে, স্থানীয় পর্যায়ে সব উন্নয়নকাজের ওপর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের (এলজিআই) সম্পূর্ণ আর্থিক নিযন্ত্রণ এবং বাস্তবায়নের কর্তৃত্ব থাকবে। যেসব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী এলজিআইয়ের কাজে সরাসরি নিয়োজিত তাঁরা এলজিআইয়ের জনপ্রতিনিধিদের অধীন হবেন। যেসব সরকারি বিভাগ এলজিআইয়ের এখতিয়ারভুক্ত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত, তারা এলজিআইয়ের জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনায় কাজ করবে। এলজিআই স্থানীয়ভাবে নিজস্ব তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে। প্রাক্কলিত তহবিল এলজিআইয়ের বাজেটের চেয়ে কম হওযার সম্ভাবনা থাকে, তবে সেই বাজেট আইনসভার উচ্চকক্ষের স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত কমিটির কাছে পাঠাতে হবে।
Leave a Reply