
ডিজেড নিউজ ২৪ ডেস্কঃ
রাতে ভাত খেয়ে ঘুমিয়েছিল মেয়েটা। পাশের রুমে বাবা-মাও ছিল। তারপর মধ্যরাতের দিকে বাবা-মা, জান্নাতী জান্নাতী, বলে মেয়েটাকে ডেকে তুলেন। ঘুম থেকে তুলে বাবা-মা মেয়েকে বলে একটু বাহিরে যাবো চলো। মেয়েটা ঘুমঘুম চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রহিল এবং বলে এতরাতে কোথায় যাবেন জিজ্ঞেস করতে থাকে। বাবা-মা কোন প্রকার উত্তর না দিয়েই বাইরে যাওয়ার জন্যে জোর করতে থাকেন। যেহেতু বাবা-মা বলছে, তাই মেয়েটা আর না করলোনা। চোখে ঘুম আর কৌতূহল নিয়েই বের হয়ে গেলো তাদের সাথে। কিছুদূর যাওয়ার পরই মেয়েটা লক্ষ্য করে দেখেন তার চাচি শাহিনা বেগমও তাদের সাথে যাচ্ছেন। মেয়েটা মনে করেছিল হয়তো সবাই একসাথে কোন দরকারি কাজে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর মেয়েটা খেয়াল করে, তার বাবা-মা বসতবাড়ির রাস্তা ছেড়ে কৃষি জমির দিকে যাচ্ছেন। মেয়েটা অবাক হয়ে আবারও তার বাবা-মা ও চাচীকে প্রশ্ন করেন, তারা এখানে কেন এসেছেন। কিন্তু বাবা-মা আর চাচি তাকে চুপ করে থাকতে বলেন। মেয়েটার চোখেমুখে তখনও ঘুমঘুম ভাব ছিল। কিছুক্ষণ পরে তারা একটা ভুট্টা ক্ষেতের কাছাকাছি আসে। এখানে এসেও কৌতূহলী হয়ে বাবা-মা আর চাচিকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল তারা এত রাতে এখানে কেন এসেছেন। কিন্তু তার আগেই পেছন থেকে জান্নাতীর হাত এবং মুখ জাপটে ধরে, যাতে সে চিৎকার করতে না পারে। তারপর মাথায় এবং শরীরে রড দিয়ে জোরে অঘাত শুরু করেন। মেয়েটা ছুটে দৌড় দিতে চেয়েছিল, কিন্তু আকস্মিক আঘাতের কারণে আর পারে নাই। তারপর বাবা-মা এবং চাচি শাহিনা বেগম মিলে ধারালো দা দিয়ে কোপাতে থাকে মেয়েটাকে। মেয়েটা তখন অনেকটাই নিস্তেজ, তীব্র যন্ত্রণায় গোংরাচ্ছিল শুধু। তিনজন মিলে অনবরত কোপাতে থাকে মেয়েটাকে, চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর সেখানেই মারা যায় মেয়েটা।
পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাবা-মা এবং চাচি মিলে মেয়েটাকে মেরে ওই ভুট্টা খেতেই রেখে চলে আসে। এ ঘটনা শনিবারের।
পরদিন সকালে স্থানীয় কৃষকেরা যখন জমিতে কাজ করতে যায় তখন সেখানে জান্নাতীর লাশ দেখতে পেয়ে খোঁজ দেয় বাবা-মাকে। তারা এসে কতক্ষণ কান্নাকাটির নাটক করে যাতে কেউ বুঝতে না পারে।তারপর মেয়ের চাচা এবং বাবা-মা মিলে প্রতিবেশী ২৭ জনের নামে মামলা করেন। তারপর পুলিশ তাৎক্ষণিক সেই প্রতিবেশীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। কিন্তু পুলিশ কিছুতেই কোন সুরাহা করতে পারছিল না। সবাই অস্বীকার করছিল। পুলিশ আরও জোর দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিন্তু কাজ হয় না।
দুইদিন পর পুলিশ লাশের ময়নাতদন্ত করে কিছু ক্লু পায়। সেই ক্লু ধরে পুলিশ মেয়েটার বাবা-মা এবং চাচা চাচিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে থানায় নিয়ে আসে। তারা থানায় এসেই ওই প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে থাকে এবং তাদেরকে ফাঁসি দিতে বলেন। বাবা-মা বারবার বলতে থাকেন আমার মেয়েটাকে ওই প্রতিবেশীরাই মিলে মেরেছে। কিন্তু পুলিশ সেই কথায় পাত্তা না দিয়ে তাদের স্বাভাবিক ইনভেস্টিগেশন চালিয়ে যেতে শুরু করেন।একপর্যায়ে যখন জোরালো জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন এবং ক্লু গুলো সামনে নিয়ে আসেন তখন চাচি শাহিনা বেগম পুলিশের কাছে স্বীকার করে ফেলেন যে, তারাই মেয়েটাকে শনিবার রাতে হত্যা করেছে। বাবা-মা তখনও স্বীকার করেনি। কিন্তু চাচি শাহিনা বেগমের স্বীকারোক্তির পর বাবা-মা ও বুঝে যায় বাঁচার আর কোন পথ নাই। তারপর মেয়েটার বাবা জাহিদুল ইসলাম এবং মা মোর্শেদা বেগমও স্বীকার করেন যে, তারা তিনজন মিলেই মেয়েটাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
তারপর মারার কারণ জিজ্ঞেস করায় তারা জানায়, প্রতিপক্ষ প্রতিবেশীদের ফাঁসাতেই তারা নিজ মেয়েকে হত্যা করেছে।
প্রতিবেশীদের সাথে তাদের একটা ৩২ বিঘা জমি নিয়ে ঝামেলা চলছিল বহুদিন ধরেই। তাই চাচি শাহিনা বেগম তাদেরকে প্ল্যান দিয়েছিল নিজ মেয়েকে হত্যা করে ওই জমিতে রেখে আসতে। তারপর তারা মামলা করবে প্রতিবেশীদের নামে। এতে করে মামলায় প্রতিবেশীদের জেল হলে তারা সহজেই ৩২ বিঘা জমিটা দখল দিয়ে নিজেদের করে নিতে পারবে। আর এজন্যই তারা ২৭ জন প্রতিবেশীর নামে মামলা করেছিল, যাতে ওই পরিবারের সবার জেল হয়। এ স্বীকারোক্তি গুলো কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইন চার্জ (ওসি) মোঃ হাবিবুল্লাহ সংগ্রহ করেছেন এবং ভেরিফাই করে সত্যায়িতও করেছেন। তাছাড়া মেয়েটাকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল, সে ঘটনার স্বীকারোক্তিও বাবা-মায়ের কাছ থেকে পুলিশ নিয়েছে।
জান্নাতী মেয়েটার বয়স খুব বেশি না, ১৫ বছর বয়স মাত্র। পড়াশোনা করতো ক্লাস নাইনে। গ্রামের সবাই এ ঘটনায় খুবই হতবাক এবং মেয়েটার জন্যে শোকাহত হয়ে কেঁদে কেঁদে বলছিল মেয়েটার আচার ব্যবহার খুবই ভালো ছিল। মেয়েটার স্কুলের শিক্ষক এবং সহপাঠীরাও জানিয়েছেন মেয়েটা পড়াশোনায় অনেক ভালো ছিল। বেঁচে থাকলে সামনের বছরই এসএসসি পরীক্ষা দিতো। হয়তো ভালো একটা রেজাল্টও করতো।
আমাদের চারপাশে কতশত দম্পতির সন্তান হয়না বিধায় এ হসপিটাল থেকে ও হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি করে দিন পার করে। একটা সন্তানের জন্যে কত হাহাকার করে।অথচ সামান্য কিছু জমির জন্যে নিজ বাবা-মা আর চাচির হাতেই খুন হতে হলো হাসিখুশি মেয়ে জান্নাতির।
©
Leave a Reply